করোনার ঝুঁকিতেও আশার আলো | বাড়বে রপ্তানি আদেশ ও বিদেশি বিনিয়োগ

করোনার এক পিঠে জীবন-জীবিকার ঝুঁকি, ঠিক উল্টো পিঠেই উঁকি দিচ্ছে সম্ভাবনা। করোনা-পরবর্তী বদলে যাওয়া বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আসতে পারে নতুন রপ্তানি আদেশ আর প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, করোনার কারণে চীনের প্রতি ইউরোপের নেতিবাচক মনোভাব আর চীন থেকে জাপানসহ উন্নত দেশের বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার আভাস বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে। বিশ্ব গণমাধ্যমের খবর আর পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এমন তথ্যই জানাচ্ছেন দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, এ ব্যাপারে বেজা, বিডাসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

https://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2020/05/05/907499

নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ, ফোর্বস, দি ডিপ্লোমেট, বিবিসি, ব্লুমবার্গসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, করোনার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে চীনের ভাবর্মূর্তি এখন প্রশ্নের মুখে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, চীন গবেষণাগারে করোনাভাইরাস বানিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপের পরাশক্তির দেশগুলোও অভিযুক্ত করছে চীনকে। স্পেন, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডস এরই মধ্যে চীনের দেওয়া করোনাভাইরাসপ্রতিরোধী কিট ও বিভিন্ন মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি ফিরিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যও করোনাভাইরাস ইস্যুতে চীনকে সন্দেহের চোখে দেখছে।

ইউরোপ-আমেরিকায় শীর্ষ পণ্য রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে চীন। ওই সব দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন যে পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে চীন থেকে পণ্য আমদানি কমে যেতে পারে। তাঁদের অনেকে বিনিয়োগও সরিয়ে নিতে পারেন।

এদিকে করোনার কারণে নিজেদের পণ্যের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখার কৌশল হিসেবে এবং সিঙ্গেল কান্ট্রি সোর্সিং বন্ধের উপায় হিসেবে জাপান তাদের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ চীন থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এরই মধ্যে চীন থেকে তাদের কম্পানি সরিয়ে নিতে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। আর চীনে থাকা ওই সব কারখানা ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় স্থানান্তর করতে চায় দেশটি।

এই সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সম্প্রতি বিশ্ব গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে সোশ্যাল মিড়িয়ায় একটি পোস্ট দিয়েছেন। তাতে তিনি জানান, জাপান চীন থেকে তাদের বিনিয়োগ সরিয়ে নিলে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি এর গন্তব্য হতে পারে বাংলাদেশও। এখন দরকার কার্যকর পদক্ষেপ। তাঁর এই উদ্ধৃতির পরই সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে অর্থনীতিবিদ, আমলা ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাঁরাও এ সম্ভাবনাকে সমর্থন করে মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জমি, উপযুক্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও বন্দর সুবিধার কারণে জাপান বাংলাদেশে বিনিয়োগে বেশ আগ্রহী। তবে এ ক্ষেত্রে জমি বরাদ্দে সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। করোনার কারণে দেশের রাজস্ব ও রপ্তানি মারাত্মক ক্ষতির মুখে। এ সময়ে বিনিয়োগে গতি ফেরাতে জমি বরাদ্দসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সহজ করলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। তিনি মনে করেন, শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে নয়, প্রযুক্তি ও লেনদেন সহজ করার মধ্য দিয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেসব বিষয় চায়, তা তাদের সহজে পৌঁছে দিলে বিনিয়োগ আসবে।

মন্তব্য করেন বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল খানও। এই সম্ভাবনাকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এসব বিষয়ে নিজেরা আলোচনা শুরু করেছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আসার যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগানো বিডা বা বেজার একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের সব মন্ত্রণালয়কে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, জাপান তাদের স্থানান্তরিত শিল্পের একটি অংশ যেন বাংলাদেশে নিয়ে আসে সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমরা এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছি।

চীন থেকে জাপানের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার অন্যতম অংশীদার যেন বাংলাদেশ হয়, এ জন্য সরকারকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, বিডা ও বেজাকে আরো তৎপর হওয়ার পক্ষে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা আখতার মাহমুদ, সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, সাবেক সচিব সরফরাজ হোসেইন, শফিকুল আজম, বিজয় ভট্টাচার্য, প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা হাবিবুল্লাহ এন করিমসহ অনেকে।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগে জাপান বেশ আগ্রহী। এরই মধ্যে দেশটির জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চীন থেকে এখন ওরা বিপুল বিনিয়োগ সরিয়ে নেবে। এর অংশীদার বাংলাদেশ হতে পারে। এ জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের জন্য উপযোগী প্যাকেজসহ যা যা করণীয় করতে হবে।

জানা যায়, করোনা-পরবর্তী সময়ে জাপানের পাশাপাশি ইউরোপের অনেক দেশই চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। সবাই চাইবে, সস্তা শ্রম, উন্নত যোগাযোগ ও বিনিয়োগবান্ধব শুল্ক-করনীতি। এসব দিতে পারলে বাংলাদেশের সামনে করোনার পর বিদেশি বিনিয়োগের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী সময়ে একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। ওই সময়ই বলা যাবে আসলে দেশগুলো কী বিনিয়োগ ও রপ্তানি-আমদানি কৌশল নেবে। তবে আমরা খুব সম্ভাবনাময় জায়গায় আছি। আমরা জেনেছি যে চীন থেকে জাপান বিনিয়োগ সরাবে। এমনিতেই জাপানের বিনিয়োগ আসছে বাংলাদেশে। নতুন প্রেক্ষাপটেও আসতে পারে। তবে সময় লাগবে। শুধু জাপানই আসবে তা নয়, প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বিচারে চীনও আসতে পারে। এ ছাড়া ইউরোপের অনেক দেশও আসবে বলে আমি মনে করি। এরই মধ্যে তুরস্ক বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী।’

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ‘জাপান আমাদের ভালো বন্ধু। এখন জাপানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা দরকার যে চীন থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া বিনিয়োগের একটি অংশ কিভাবে বাংলাদেশে আনা যায়। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী সহসাই জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করতে পারেন। এতে সম্পর্ক জোরদার হবে। দেশটির সঙ্গে পেন্ডিং বিষয়গুলোরও দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার।’ তিনি বলেন, ‘চীনবিরোধী একটি সেন্টিমেন্ট গড়ে উঠেছে ইউরোপ-আমেরিকায়। এটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের জন্য ইতিবাচক। রপ্তানিকারকরা আমাদের ছয় বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলছে। আমি মনে করি, তার অর্ধেকও ক্ষতি হবে না। আমাদের সম্ভাবনা বাড়ছে। এটাও কাজে লাগাতে হবে।’

বিনিয়োগের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ারও সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্বে চীনের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে তার ফলে চীন থেকে তাদের রপ্তানি আদেশ বিশ্বের অন্যদিকে স্থানান্তরিত হতে পারে। আমিও আশা করি, করোনা-পরবর্তী বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের সম্ভাবনা ভালো। তবে এর জন্য করোনা উপদ্রবের পর অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে। সে সময় পর্যন্ত আমাদের টিকে থাকতে হবে। মার্চ-এপ্রিলে রপ্তানি আদেশ স্থগিত হলেও ক্রমেই তা ফিরছে।’

জানা যায়, মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাসে কমবেশি আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশ স্থগিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাতিলও হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের স্থগিতাদেশ তুলে নিয়েছে। তারা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের পণ্য সরবরাহের কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশের বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম উদ্যোক্তাদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে।

ইউরোপের অন্যতম বড় ক্রেতা দেশ সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে তাদের রপ্তানি আদেশ অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। একইভাবে ডেনমার্কও করোনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে।

শুধু পোশাক নয়, বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্রয়াদেশও ফিরছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ খাতের উদীয়মান রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জিহান ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজাদা আহমেদ রনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে ইউরোপের কয়েকটি ছাড়া সব দেশেই আমাদের অর্ডার আছে। উল্লেখ করার মতো ক্ষতি আমাদের হয়নি। সামনেও ভালো অর্ডার আছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে যেসব দেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই সব দেশেও আমাদের পণ্যের অর্ডার পাব। তিনি জানান, তাঁর কারখানার চামড়াজাত পণ্য ও পরিবেশবান্ধব জুতা আমেরিকাতেও রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে।

সেবা পণ্য রপ্তানিরও সম্ভাবনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন আইটি খাতের আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান কাজী আইটির চেয়ারম্যান মাইক কাজী। তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে কিছুটা স্থবিরতায় আছি ঠিক; তবে পরিস্থিতির উত্তোরণ ঘটলে আমাদের কাজ আরো বেড়ে যাবে। দেশে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বাড়বে বলে আমি মনে করি।’